মৌর্য রাজবংশের উৎপত্তি ও উৎস, তাদের পতনের কারণ | গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর | মৌর্য রাজবংশ সম্পর্কে সবকিছু | The Complete History of the Mauryan Dynasty
Sofol,
Hi Aspirants,
আজকে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করবো, মৌর্য বংশের সম্পূর্ণ ইতিহাস ; যেটির মধ্যে মৌর্য বংশের ইতিহাস, মৌর্য বংশের সম্পূর্ণ তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর ইত্যাদি জেনে নিন। যা বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । তাই আর সময় নষ্ট না করে নীচ থেকে ভালোভাবে দেখে নিন |
১. মৌর্য রাজবংশ
মৌর্য রাজবংশ ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ সালে তিনি কৌটিল্য এর সহায়তায় নন্দ বংশের শেষ রাজা ধননন্দকে পরাজিত করে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটির রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র।
মৌর্য রাজবংশে মোট ৯ জন সম্রাট রাজত্ব করেছিলেন তাদের মধ্যে প্রধান তিনজন হলেন _
রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, চন্দ্রগুপ্তের পুত্র বিন্দুসার ও বিন্দুসারের পুত্র এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসকদের একজন সম্রাট অশোক |
২.ভূমিকা
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে মৌর্য রাজবংশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই রাজবংশ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি বিশাল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। মৌর্য রাজবংশ ভারতকে কেবল রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধই করেনি বরং শিল্প, সংস্কৃতি, শাসনব্যাবস্থা এবং ধর্মীয় সহনশীলতার এক অনন্য দৃষ্ঠান্ত স্থাপন করে গেছে | এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তাঁর অসাধারণ সাহস, বুদ্ধি ও রাজনৈতিক দক্ষতার ফলে ভারতবর্ষের একটি বড় অংশ এক শাসনের অধীনে আসে। তাঁর পর তাঁর পুত্র বিন্দুসার সাম্রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেন। এরপর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র সম্রাট অশোক। অশোক শুধু একজন শক্তিশালী শাসকই ছিলেন না, তিনি পরবর্তীকালে শান্তি, দয়া ও মানবকল্যাণের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।
মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়কাল সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২/৩২১ সাল থেকে ১৮৫ সাল পর্যন্ত ধরা হয়। এই সময়ে ভারতীয় রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, শিল্প, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
________________________________________
৩.মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
মৌর্য সাম্রাজ্যের আগে উত্তর ভারতে নন্দ রাজবংশের শাসন ছিল। কিন্তু নন্দ শাসকদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে নন্দ বংশের শেষ রাজা ধননন্দকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তার মন্ত্রী চানক্য বা কৌটিল্যএর পূর্ণ সহযোগিতায় পরাজিত করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে |
চন্দ্রগুপ্তের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন চাণক্য, যিনি কৌটিল্য নামেও পরিচিত। চাণক্য ছিলেন একজন দক্ষ শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি চন্দ্রগুপ্তকে শিক্ষা দেন এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে তাঁকে সাহায্য করেন।
চন্দ্রগুপ্ত প্রথমে নন্দদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে মগধের সিংহাসন দখল করেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
________________________________________
১.চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন প্রাচীন ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট।
চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য বিস্তার
চন্দ্রগুপ্তের সময়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থির। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পর উত্তর-পশ্চিম ভারতে অনেক ছোট ছোট রাজ্য ও শাসক ছিল। চন্দ্রগুপ্ত এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেন।
তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের অনেক অঞ্চল নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর সাম্রাজ্য পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাস নিকোটরের সাথে যুদ্ধে চন্দ্রগুপ্ত জয়লাভ করেন, তাঁদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এর ফলে চন্দ্রগুপ্ত কিছু অঞ্চল লাভ করেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্তের দরবারে এসেছিলেন। তিনি ভারত সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্ডিকা’-তে অনেক তথ্য লিখেছিলেন।
চন্দ্রগুপ্তের প্রশাসন
চন্দ্রগুপ্ত একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। রাজাকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল।
চাণক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, করব্যবস্থা, গুপ্তচর ব্যবস্থা, আইন ও প্রশাসন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। তবে গ্রন্থটির বর্তমান রূপ কোন সময়ে সম্পূর্ণ হয়েছে তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
চন্দ্রগুপ্তের শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শক্তিশালী সেনাবাহিনী। বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা ও নিরাপত্তার জন্য তিনি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছিলেন।
চন্দ্রগুপ্তের শেষ জীবন
জৈন ঐতিহ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ দিকে চন্দ্রগুপ্ত জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। জীবনের শেষভাগে তিনি সিংহাসন ত্যাগ করে তাঁর পুত্র বিন্দুসারের হাতে দিয়ে দক্ষিণ ভারতে যান বলে ঐতিহ্যে উল্লেখ আছে। জৈন ধর্ম গ্রহণ করে কর্ণাটকের শ্রবণবেলগোলায় গিয়ে উপবাসের মাধ্যমে তাঁর শেষনিংশ্বাস ত্যাগ করে |
________________________________________
২.বিন্দুসার
প্রাচীন ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট অথবা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পুত্র এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোকের পিতা হলেন বিন্দুসার | তাঁর শাসনকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৯৭ থেকে ২৭২ সাল পর্যন্ত ধরা হয়।
বিন্দুসার তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত বিশাল সাম্রাজ্যকে ধরে রাখেন এবং দক্ষিণ ভারতের দিকে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। তাঁর শাসনকালে মগধ সাম্রাজ্য আরও শক্তিশালী হয়।
বিন্দুসারের পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন অশোক।
________________________________________
৩.সম্রাট অশোক
মৌর্য রাজবংশের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হলো সম্রাট অশোক। তিনি ছিলেন বিন্দুসারের পুত্র। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮ সালে তিনি সিংহাসনে বসেন।
অশোক প্রথম জীবনে একজন শক্তিশালী ও কঠোর শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে কলিঙ্গ যুদ্ধের পরে।
________________________________________
৪.কলিঙ্গ যুদ্ধ
অশোকের শাসনকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কলিঙ্গ যুদ্ধ। বর্তমান ওড়িশা অঞ্চলের কলিঙ্গ ছিল একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য। অশোক কলিঙ্গ জয় করার জন্য যুদ্ধ করেন।
খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ অব্দে ওড়িশার কলিঙ্গ যুদ্ধে প্রচুর মানুষ নিহত ও আহত হয় এবং বহু মানুষ গৃহহীন হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অশোকের মনে গভীরভাবে অনুশোচনা ও বৈরাগ্যের জম্ম হয় | তাঁর শিলালিপিতে কলিঙ্গ যুদ্ধের পর তাঁর অনুশোচনার কথা জানা যায়।
এই যুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
________________________________________
৫.অশোকের ধর্মনীতি
কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোক যুদ্ধ ও হিংসার পরিবর্তে শান্তি ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন।
তবে অশোকের ‘ধম্ম’ ছিল শুধু বৌদ্ধ ধর্মীয় মত প্রচার নয়। তিনি মানুষের মধ্যে দয়া, সত্যবাদিতা, পিতামাতার প্রতি সম্মান, সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি এবং নৈতিক জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি স্থাপন করেন। এসব লিপির মাধ্যমে তিনি প্রজাদের কাছে তাঁর নীতি ও নির্দেশ পৌঁছে দিতেন।
________________________________________
৬.অশোকের জনকল্যাণমূলক কাজ
অশোক শুধু ধর্ম প্রচার করেননি, মানুষের কল্যাণের জন্যও বিভিন্ন কাজ করেছিলেন।
তিনি মানুষের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা, রাস্তার পাশে গাছ লাগানো এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করার মতো জনকল্যাণমূলক কাজের প্রতি গুরুত্ব দেন। পশুদের প্রতিও তিনি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
অশোক বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের মধ্যে সহনশীলতা বজায় রাখার কথা বলেছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থায় নৈতিকতা ও জনকল্যাণকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছিল।
________________________________________
৭.বৌদ্ধধর্মের প্রসারে অশোকের ভূমিকা
সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়ে বৌদ্ধধর্ম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বিস্তৃত হয়।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, তাঁর পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রা শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে, এমনকি সাম্রাজ্যের সবর্ত্র যাতে মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক নিয়ম মেনে চলে এবং জনগনের মধ্যে যাতে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় থাকে সেজন্য তিনি ধর্ম মহামাত্র নামক এক বিশেষ শ্রেনীর রাজকর্মচারী নিযুক্ত করেন |
অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপত্যেরও উন্নতি ঘটে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত স্তূপ, স্তম্ভ ও শিলালিপি আজও প্রাচীন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
________________________________________
৮.অশোকের শিলালিপি
অশোকের শিলালিপি তাঁর শাসন সম্পর্কে জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শিলালিপি পাওয়া গেছে।
এই লিপিগুলোতে তাঁর প্রশাসন, নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং প্রজাদের কল্যাণ সম্পর্কে নানা তথ্য রয়েছে।
অশোকের বিখ্যাত সিংহস্তম্ভের শীর্ষভাগ বর্তমানে ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সারণাথের এই সিংহস্তম্ভের নিচের ধর্মচক্র ভারতের জাতীয় পতাকাতেও স্থান পেয়েছে।
________________________________________
৯.মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রশাসন
মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল একটি সুসংগঠিত সাম্রাজ্য। রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে কেন্দ্রীয় প্রশাসন পরিচালিত হতো। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন।
কর আদায়, আইনশৃঙ্খলা, কৃষি, বাণিজ্য ও সামরিক ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল।
মৌর্যদের সময়ে কৃষি ছিল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও উন্নত হয়েছিল। স্থলপথ ও নদীপথে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য চলত।
________________________________________
১০.মৌর্য সাম্রাজ্যের শিল্প ও স্থাপত্য
মৌর্য যুগে ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। পাথরের স্তম্ভ, স্তূপ এবং বিভিন্ন স্থাপত্য এই যুগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
অশোকের পালিশ করা পাথরের স্তম্ভগুলো প্রাচীন ভারতীয় শিল্পের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সারণাথের সিংহস্তম্ভ তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত।
________________________________________
১১.মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন
অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন অঞ্চলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় এবং সাম্রাজ্য ভেঙে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হতে থাকে।
অশোকের পর একাধিক শাসক সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু তাঁদের কেউই অশোকের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারেননি।
শেষ মৌর্য সম্রাট ছিলেন বৃহদ্রথ। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ সালে তাঁর সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ তাঁকে হত্যা করে শুঙ্গ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
________________________________________
১২.মৌর্য রাজবংশের গুরুত্ব
ভারতের ইতিহাসে মৌর্য রাজবংশের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই রাজবংশ প্রথমবারের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের একটি বিশাল অংশকে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসে।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শক্তিশালী রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভিত্তি তৈরি করেন। বিন্দুসার সাম্রাজ্যকে ধরে রাখেন এবং বিস্তার ঘটান। আর অশোক যুদ্ধজয়ের পরিবর্তে শান্তি ও মানবকল্যাণের আদর্শকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিহাসে অনন্য স্থান অর্জন করেন।
মৌর্য যুগের প্রশাসন, অর্থনীতি, স্থাপত্য, শিল্প এবং ধর্মীয় ইতিহাস পরবর্তী ভারতীয় সভ্যতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
________________________________________
১৩.উপসংহার
মৌর্য রাজবংশ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তাঁর সাহস, বুদ্ধি ও রাজনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি বিন্দুসার সেই সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করেন। এরপর সম্রাট অশোক মৌর্য সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ বিস্তারে নিয়ে যান।
কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোকের জীবনে যে পরিবর্তন আসে, তা তাঁকে একজন বিজয়ী সম্রাট থেকে শান্তি ও মানবতার দূত হিসেবে পরিচিত করে। তাঁর শিলালিপি, স্তম্ভ এবং নৈতিক শিক্ষার প্রভাব আজও ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে দেখা যায়।
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হলেও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও সম্রাট অশোকের নাম ভারতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁদের জীবন ও কর্ম থেকে আমরা দেশ পরিচালনা, সাহস, মানবতা, শান্তি এবং মানুষের কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই।
________________________________________
১৪.পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর
১. মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?
উত্তর: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।
২. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান উপদেষ্টা কে ছিলেন?
উত্তর: চাণক্য বা কৌটিল্য।
৩. চাণক্যের রচিত বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: অর্থশাস্ত্র।
৪. মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় আনুমানিক কত খ্রিস্টপূর্বাব্দে?
উত্তর: ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
৫. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজধানী কোথায় ছিল?
উত্তর: পাটলিপুত্র।
৬. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কোন গ্রিক শাসকের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন?
উত্তর: সেলিউকাস নিকাটর।
৭. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও সেলিউকাসের মধ্যে সন্ধি কবে হয়?
উত্তর: আনুমানিক ৩০৫–৩০৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে।
৮. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দরবারে কোন গ্রিক দূত এসেছিলেন?
উত্তর: মেগাস্থিনিস।
৯. মেগাস্থিনিসের লেখা গ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: ইন্ডিকা (Indica)।
১০. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পর কে সিংহাসনে বসেন?
উত্তর: বিন্দুসার।
১১. বিন্দুসারের উপাধি কী ছিল?
উত্তর: অমিত্রঘাত বা অমিত্রঘাতক।
১২. বিন্দুসারের পুত্র কে ছিলেন?
উত্তর: সম্রাট অশোক।
১৩. মৌর্য বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে কাকে ধরা হয়?
উত্তর: সম্রাট অশোক।
১৪. অশোকের সিংহাসনে আরোহণ আনুমানিক কত খ্রিস্টপূর্বাব্দে?
উত্তর: ২৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
১৫. অশোকের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ কোনটি?
উত্তর: কলিঙ্গ যুদ্ধ।
১৬. কলিঙ্গ যুদ্ধ কবে সংঘটিত হয়?
উত্তর: আনুমানিক ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
১৭. কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোক কী গ্রহণ করেন?
উত্তর: বৌদ্ধধর্মের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হন এবং ধম্মনীতির প্রচার করেন।
১৮. অশোকের শিলালিপিতে কোন যুদ্ধের উল্লেখ রয়েছে?
উত্তর: কলিঙ্গ যুদ্ধ।
১৯. অশোকের অধিকাংশ শিলালিপি কোন লিপিতে লেখা?
উত্তর: ব্রাহ্মী লিপি।
২০. উত্তর-পশ্চিম ভারতে অশোকের শিলালিপিতে কোন লিপি ব্যবহৃত হয়েছিল?
উত্তর: খরোষ্ঠী লিপি।
২১. অশোকের শিলালিপি পাঠোদ্ধার করেন কে?
উত্তর: জেমস প্রিন্সেপ।
২২. অশোকের শিলালিপিতে তিনি কোন নামে পরিচিত?
উত্তর: দেবানাংপিয় পিয়দর্শী (দেবানম্পিয় পিয়দসী)।
২৩. অশোক বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: ধর্মপ্রচারক ও দূত বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন।
২৪. অশোকের পুত্রের নাম কী?
উত্তর: মহেন্দ্র।
২৫. অশোকের কন্যার নাম কী?
উত্তর: সংঘমিত্রা।
২৬. মহেন্দ্র ও সংঘমিত্রা কোথায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যান?
উত্তর: শ্রীলঙ্কায়।
২৭. অশোকের সময় কোন বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর: তৃতীয় বৌদ্ধ সংঘীতি।
২৮. তৃতীয় বৌদ্ধ সংঘীতি কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর: পাটলিপুত্রে।
২৯. তৃতীয় বৌদ্ধ সংঘীতির সভাপতি কে ছিলেন?
উত্তর: মোগ্গলিপুত্ত তিস্স।
৩০. ভারতের জাতীয় প্রতীকের মূল উৎস কী?
উত্তর: সারনাথের অশোকস্তম্ভের সিংহমূর্তি।
৩১. ভারতের জাতীয় প্রতীকে কয়টি সিংহ দেখা যায়?
উত্তর: তিনটি; মূল ভাস্কর্যে চারটি সিংহ রয়েছে।
৩২. ভারতের জাতীয় প্রতীকের নিচে কোন বাণী লেখা আছে?
উত্তর: “সত্যমেব জয়তে”।
৩৩. অশোকের স্তম্ভগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: পালিশ করা বেলেপাথর ও উৎকৃষ্ট ভাস্কর্যশৈলী।
৩৪. মৌর্য সাম্রাজ্যের শেষ শাসক কে ছিলেন?
উত্তর: বৃহদ্রথ।
৩৫. বৃহদ্রথকে কে হত্যা করেন?
উত্তর: পুষ্যমিত্র শুঙ্গ।

No comments:
Post a Comment