Breaking





Wednesday, September 30, 2026

ভারতের কৃষি বিপ্লবের ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য || গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর || History of India Agricultural Revolution

ভারতের কৃষি বিপ্লবের প্রভাব আলোচনা ||  সবুজ বিপ্লবের জনক তালিকা || গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর || History of India Agricultural Revolution

ভারতের কৃষি বিপ্লবের প্রভাব আলোচনা ||  সবুজ বিপ্লবের জনক তালিকা || গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর || History of India Agricultural Revolution

Sofol,

Hi Aspirants,

               আজকে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করবো,ভারতের কৃষি বিপ্লবের ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, প্রশ্ন ও উত্তর ইত্যাদি জেনে নিন। যা বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । তাই আর সময় নষ্ট না করে নীচ থেকে ভালোভাবে দেখে নিন |

ভারতের কৃষি বিপ্লবের ইতিহাস

ভূমিকা

ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো এই নতুন রাষ্ট্রটিও তীব্র খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। এর আগে ১৯৪৩ সালে বাংলায় যুদ্ধজনিত দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে, উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষিপ্রধান রাজ্য পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠনের চুক্তি হওয়ায় দেশের খাদ্য সরবরাহ আবারও ব্যাহত হয়। এই ভূখণ্ডগত বিভাজনের ফলে পাঞ্জাব তার কোনো প্রধান কৃষি গবেষণা কেন্দ্রও হারায়, কারণ পাঞ্জাবের লায়ালপুরের কৃষি মহাবিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি তখন পাকিস্তানে অবস্থিত ছিল। এই ঘাটতি পূরণের জন্য ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য আমদানির উপর নির্ভর করতে শুরু করে।

প্রকৃতপক্ষে, শীতল যুদ্ধের সময়কালের বেশিরভাগ সময় জুড়েই, তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (১৯৬৬-১৯৮৪) প্রকাশ্যে তা স্বীকার না করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সাহায্যের জন্য "আশা" করতেন। ভারত ১৯৬৪-৬৫ এবং ১৯৬৫-৬৬ সালে দুটি ভয়াবহ খরার সম্মুখীন হয়েছিল, যার ফলে আবারও খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই ঘটনাগুলোর ফলস্বরূপ ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ফুড ফর এইড প্রোগ্রাম' থেকে ৫০ লক্ষ টন গম সহায়তা পেয়েছিল। সামগ্রিকভাবে, ১৯৫০ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫ কোটি টন জরুরি খাদ্য কেনার জন্য ভারত মোট ১০ বিলিয়ন ডলারের ছাড়যুক্ত খাদ্য বিক্রয় সহায়তা পেয়েছিল। ভারত সরকার আশঙ্কা করেছিল যে ১৯৮০-এর দশকের মধ্যে তার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দিতে প্রতি বছর আনুমানিক ১ কোটি টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে এবং এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য তখন তাদের কোনো সামগ্রিক পরিকল্পনা ছিল না।

তবে, উত্তর-পশ্চিম ভারতের ছোট্ট রাজ্য পাঞ্জাবের গল্পটা ছিল ভিন্ন। পাঞ্জাব নামটি ব্যুৎপত্তিগতভাবে ফারসি শব্দ 'পাঞ্জ' (পাঁচ) এবং 'আব' (জল) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ "পাঁচ নদীর দেশ"। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর, যা পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল, পাঞ্জাব ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২% জুড়ে ছিল। বিভাজনের পর অর্থনীতি পুনর্গঠন করে পাঞ্জাব ভারতের অন্যতম ধনী রাজ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়। নামের মতোই প্রাকৃতিক ভূ-পৃষ্ঠের জলসম্পদে সমৃদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ও ভূমি সংস্কারে আগ্রহী হওয়ায়, রাজ্য সরকার সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সম্পদ, কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের ভিত্তি এবং জনগণের জন্য একটি শক্তিশালী সমবায় ঋণ কাঠামো গড়ে তোলার জন্যও কাজ করেছে। এমন এক সময়ে যখন সমগ্র ভারত তার নাগরিকদের খাদ্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন পাঞ্জাব রাজ্য ১৯৫০-১৯৬৪ সালের মধ্যে (সবুজ বিপ্লবের আগে) কৃষি উৎপাদনে ৪.৬% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এবং এর ফলে তার জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে স্বনির্ভরতার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে (ভল্লা প্রমুখ, ১৯৯০)। সবুজ বিপ্লবের রূপে যখন সুযোগ উপস্থিত হলো, তখন দেশের কৃষকেরা সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিলেন।


১. স্বাধীনতার আগে ভারতের কৃষি

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় কৃষি মূলত জীবিকাভিত্তিক ছিল। কৃষকদের একটি বড় অংশ প্রথাগত পদ্ধতিতে চাষ করতেন। সেচব্যবস্থা সীমিত থাকায় কৃষি অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল। উন্নতমানের বীজ, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, রাসায়নিক সার এবং বৈজ্ঞানিক কৃষি-পরামর্শের ব্যবহারও সীমিত ছিল।

জমিদারি ও বিভিন্ন ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার কারণে অনেক কৃষক অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। খরা, বন্যা ও দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতো। ফলে স্বাধীনতার পর ভারতের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা।


২. স্বাধীনতার পর কৃষি উন্নয়নের সূচনা

১৯৫১ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু হওয়ার পর কৃষি উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি সংস্কার এবং কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করা হয়। কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, কৃষি সম্প্রসারণ পরিষেবা এবং বিভিন্ন সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়। 

৩. সবুজ বিপ্লব

ভারতের কৃষি ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সবুজ বিপ্লব ।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, সেটিই সবুজ বিপ্লব নামে পরিচিত।

ভারতে সবুজ বিপ্লবের সঙ্গে ড. এম. এস. স্বামীনাথন-এর নাম বিশেষভাবে যুক্ত। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল গমের জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে নরম্যান বোরলগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।সবুজ বিপ্লব প্রথমদিকে বিশেষ করে গম উৎপাদনে  সাফল্য আনে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মতো সেচসমৃদ্ধ অঞ্চলে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।

সবুজ বিপ্লবের প্রধান উপাদান

১. উচ্চফলনশীল জাতের বীজ

২. সেচের সম্প্রসারণ

৩. রাসায়নিক সার ব্যবহার

৪. কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার

৫. কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার

৬. কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ পরিষেবা

৭. কৃষিঋণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা

৮. ন্যূনতম সহায়ক মূল্যসহ বাজার সহায়তা

সবুজ বিপ্লবের ফলাফল

সবুজ বিপ্লবের ফলে ভারতের খাদ্যশস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গম উৎপাদনে বিশেষ সাফল্য দেখা যায় এবং খাদ্য আমদানির ওপর ভারতের নির্ভরতা কমতে থাকে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণও বৃদ্ধি পায়। প্রাথমিক পর্যায়ে সবুজ বিপ্লবের সুবিধা কিছু নির্দিষ্ট ফসল ও অঞ্চলে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং মাটির গুণমানের অবনতি নিয়ে পরবর্তীকালে উদ্বেগ তৈরি হয়।


৪. সাদা বিপ্লব

দুধ উৎপাদনে বৃদ্ধিকে বলা হয় সাদা বিপ্লব (White Revolution)।

ভারতে সাদা বিপ্লবের সঙ্গে অপারেশন ফ্লাড (Operation Flood) কর্মসূচির নাম বিশেষভাবে যুক্ত। এটি ১৯৭০ সালে শুরু হয় এবং এর অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন ড. ভার্গিস কুরিয়েন। এর উদ্দেশ্য ছিল দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করা, দুধ সংগ্রহ ও বিপণনের জন্য সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষক ও পশুপালকদের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।

সাদা বিপ্লবের গুরুত্ব

* দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

* গ্রামীণ মানুষের আয়ের সুযোগ বাড়ে।

* দুগ্ধ সমবায়ের বিস্তার ঘটে।

* পশুপালন কৃষির গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

* ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুধ উৎপাদক দেশে পরিণত হয়।

৫. নীল বিপ্লব

মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির আন্দোলনকে বলা হয় নীল বিপ্লব (Blue Revolution)।
ভারতের নদী, পুকুর, হ্রদ, জলাশয় এবং সমুদ্রভিত্তিক মৎস্যসম্পদকে কাজে লাগিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

নীল বিপ্লবের ফলে—

* মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে,
* মৎস্যচাষে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে,
* উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষের প্রসার ঘটেছে,
* বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।


৬. হলুদ বিপ্লব

তেলবীজ উৎপাদনের বৃদ্ধি-কে সাধারণভাবে হলুদ বিপ্লব (Yellow Revolution) বলা হয়।

১৯৮০-এর দশকে তেলবীজ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য Technology Mission on Oilseeds- সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরিষা, চিনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী ইত্যাদি বীজের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভোজ্যতেলের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে আমদানিনির্ভরতা কমানো।


৭. রূপালি বিপ্লব

ডিম ও পোলট্রি উৎপাদনের বৃদ্ধির সঙ্গে রূপালি বিপ্লব (Silver Revolution)-এর ধারণা যুক্ত।

পোলট্রি শিল্পে উন্নত জাত, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত খাদ্য, টিকাকরণ এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার ফলে ডিম উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।এর ফলে গ্রামীণ ও শহরতলি অঞ্চলে পোলট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কৃষি-সহযোগী খাতে পরিণত হয়।

৮. লাল বিপ্লব

মাংস ও টমেটো উৎপাদনের বৃদ্ধির সঙ্গে লাল বিপ্লব (Red Revolution)শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহার করা হয়। তবে বিভিন্ন বই ও সাধারণ জ্ঞানসূত্রে এর সংজ্ঞায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

মাংস ও পশুপালন শিল্পের আধুনিকীকরণ, পশুস্বাস্থ্য পরিষেবা, উন্নত জাত এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফলে পশুপালন খাতে উৎপাদন ও বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।


৯. গোলাপি বিপ্লব

ভারতের কৃষি ও খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রসঙ্গে গোলাপি বিপ্লব (Pink Revolution) শব্দটি সাধারণত চিংড়ি, মাংস বা কিছু ক্ষেত্রে পেঁয়াজ উৎপাদন/প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে বিভিন্ন উৎসে যুক্ত করা হয়। 

চিংড়ি চাষ ও রপ্তানি ভারতের জলজ কৃষি অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক অ্যাকুয়াকালচারের প্রসার ঘটে।

১০. সোনালি বিপ্লব

ফল, উদ্যানপালন ও মধু উৎপাদনের সঙ্গে সোনালি বিপ্লব (Golden Revolution)-এর ধারণা যুক্ত।

ভারতে উদ্যানপালন খাতের মধ্যে রয়েছে—

* ফল,
* সবজি,
* ফুল,
* মসলা,
* ঔষধি উদ্ভিদ,
* নার্সারি ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসল।

উদ্যানপালন কৃষকদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করে।


১১. চিরসবুজ বিপ্লব

সবুজ বিপ্লবের সাফল্যের পর কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। চিরসবুজ বিপ্লব (Evergreen Revolution) শব্দটি যুক্ত।ড. এম. এস. স্বামীনাথন টেকসই কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই ধারণাকে গুরুত্ব দেন।

চিরসবুজ বিপ্লবের মূল লক্ষ্য হলো—

* উৎপাদন বৃদ্ধি 
* পরিবেশ সংরক্ষণ 
* কৃষকের আয় বৃদ্ধি 
* দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা।

এক্ষেত্রে জল সংরক্ষণ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জৈব ও সমন্বিত কৃষি, উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।


১২. কৃষি যান্ত্রিকীকরণ

ভারতের কৃষি বিপ্লব শুধু বীজ ও সারনির্ভর ছিল না। কৃষিতে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার, পাম্পসেট, থ্রেশার এবং অন্যান্য যন্ত্রের ব্যবহার কৃষিকাজের গতি বাড়িয়েছে।

যান্ত্রিকীকরণের ফলে—

* জমি চাষ দ্রুত হয়,
* শ্রমের প্রয়োজনীয়তা অনেক ক্ষেত্রে কমে,
* ফসল কাটার সময় কমে,
* বড় জমিতে কৃষিকাজ সহজ হয়,
* কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি পায়।

তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আধুনিক যন্ত্রের খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। তাই কাস্টম হায়ারিং সেন্টারের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র ভাড়ায় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


১৩. কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা

কৃষি বিপ্লবের পেছনে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন, রোগ প্রতিরোধী ফসল, জলবায়ু সহনশীল জাত, মাটির স্বাস্থ্য এবং কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে।ভারতের Indian Council of Agricultural Research (ICAR) কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান।



১৪. কৃষি বিপ্লব ও খাদ্যনিরাপত্তা

ভারতের কৃষি বিপ্লবের অন্যতম বড় ফল হলো খাদ্যশস্য উৎপাদনের ব্যাপক বৃদ্ধি। স্বাধীনতার প্রথম দিকে খাদ্য ঘাটতি ভারতের জন্য বড় সমস্যা ছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে। তবে খাদ্যনিরাপত্তা শুধু খাদ্যের মোট উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। খাদ্যের প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টিমান এবং সুষম বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কৃষি বিপ্লব তালিকা

বিপ্লব সম্পর্কিত জনক
স্বর্ণালি বিপ্লব ফল, মধু ও উদ্যান পালন নিরপেখ টুটেজ
রুপালী বিপ্লব ডিম ইন্দিরা গান্ধী
হলুদ বিপ্লব তৈলবীজ শ্যাম পিট্রোডা
সবুজ বিপ্লব দানাশস্য এম. এস. স্বামীনাথন
শ্বেত বিপ্লব দুগ্ধ ভার্গিস কুরিয়েন
নীল বিপ্লব মৎস্য ড. অরুণ কৃষ্ণাণ
গোলাপি বিপ্লব ফার্মাসিউটিক্যালস, চিংড়ি ও পেঁয়াজ দুর্গেশ প্যাটেল
বাদামী বিপ্লব চামড়া, কোকো ও অপ্রচলিত শক্তি ***
লাল বিপ্লব মাংস ও টম্যাটো বিশাল তিওয়ারি
সোনালি তন্তু বিপ্লব পাট ***
রুপালী তন্তু বিপ্লব তুলা ***
কালো বিপ্লব পেট্রোলিয়াম ***
চিরহরিৎ বিপ্লব কৃষি ***
গোল বিপ্লব আলু ***
ধূসর বিপ্লব সার ***


::গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর::

১. কৃষি বিপ্লব কী?
উত্তর: আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সার, সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়াকে কৃষি বিপ্লব বলে।

২. ভারতে সবুজ বিপ্লব কবে শুরু হয়?
উত্তর: ভারতে মূলত ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সবুজ বিপ্লব শুরু হয়।

৩. ভারতের সবুজ বিপ্লবের জনক কে?
উত্তর: ভারতে সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে ড. এম. এস. স্বামীনাথন-কে উল্লেখ করা হয়।

৪. সবুজ বিপ্লবের প্রধান উপাদান কী কী?
উত্তর: উচ্চফলনশীল বীজ, সেচ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, কৃষিযন্ত্র এবং উন্নত কৃষি প্রযুক্তি।

৫. সবুজ বিপ্লবের ফলে কোন ফসলের উৎপাদন বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়?
উত্তর: গম ও ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে; প্রথম পর্যায়ে গমে সাফল্য বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল।

৬. ভারতের কোন রাজ্যগুলিতে সবুজ বিপ্লবের প্রভাব বেশি ছিল?
উত্তর:পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

৭. সাদা বিপ্লব কী?
উত্তর: দুধ উৎপাদন ও দুগ্ধশিল্পের ব্যাপক বৃদ্ধিকে সাদা বিপ্লব বলে।

৮. সাদা বিপ্লবের সঙ্গে কার নাম যুক্ত?
উত্তর: ড. ভার্গিস কুরিয়েন-এর নাম সাদা বিপ্লবের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।

৯. অপারেশন ফ্লাড কী?
উত্তর: দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দুগ্ধ সমবায় ব্যবস্থা সম্প্রসারণের জন্য ১৯৭০ সালে শুরু হওয়া একটি বৃহৎ কর্মসূচি হলো অপারেশন ফ্লাড।

১০. নীল বিপ্লব কী?
উত্তর: মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিকে নীল বিপ্লব বলে।

১১. হলুদ বিপ্লব কী?
উত্তর: তেলবীজের উৎপাদন বৃদ্ধিকে সাধারণভাবে হলুদ বিপ্লব বলা হয়।

১২. রূপালি বিপ্লব কী?
উত্তর: ডিম ও পোলট্রি উৎপাদনের ব্যাপক বৃদ্ধিকে রূপালি বিপ্লব বলা হয়।

১৩. সোনালি বিপ্লব কী?
উত্তর: উদ্যানপালন, বিশেষ করে ফল, সবজি, ফুল ও মধু উৎপাদনের বৃদ্ধির সঙ্গে সোনালি বিপ্লবের ধারণা যুক্ত।

১৪. চিরসবুজ বিপ্লব কী?
উত্তর: পরিবেশের ক্ষতি না করে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার ধারণাকে চিরসবুজ বিপ্লব বলা হয়।

১৫. কৃষি বিপ্লবের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিকে আধুনিক ও উৎপাদনশীল করা।

১৬. সবুজ বিপ্লবের দুটি সুফল লেখো।
উত্তর:
১. খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
২. খাদ্য আমদানির ওপর ভারতের নির্ভরতা কমে।

১৭. সবুজ বিপ্লবের দুটি অসুবিধা লেখো।
উত্তর:
১. আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
২. অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

১৮. কৃষি বিপ্লব ভারতের অর্থনীতিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ আয় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে কৃষি বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।


No comments:

Post a Comment

11